অনলাইনে ব্যবসা হোক নিজের ডোমেইনে নিজের পরিচয়ে

অনলাইনে ব্যবসা করার জন্য ইন্টারনেটের মহাসাগরে চাই নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয়। চাই নিজের একটি স্বাচ্ছ্যন্দ গৃহকোণ। কাব্যিক করে বললে হয়তো এরকমই শুনায় কিন্তু আসলে আমরা এখানে কথা বলছি বেশ টেকনিক্যাল কিছু ব্যাপার স্যাপার নিয়ে। নিজের পরিচয় হল আপনার ব্যবসার Domain Name আর গৃহকোণ হল আপনার ওয়েবসাইটের Hosting। ঠিকঠাক ডোমেইন নেম সিলেক্ট করা নিয়ে শুধু নতুন উদ্যোক্তাদের যে সমস্যায় পড়তে হয় তা ভাবলে ভুল হবে। এমন অনেক  ঘটনা  দেখা যায় যেখানে ব্যবসা ভালো ভাবে দাঁড় করানোর পর ব্যবসায়ী নিজেদের ওয়েবসাইট তৈরির সিদ্ধান্তটা  গ্রহণ করেন। এর কারণগুলো হতে পারেঃ

  • বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে আপনার পণ্য বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে এবং আপনি আপনার ব্যবসার রেঞ্জ আরো বাড়াতে চাচ্ছেন। আপনি চান নিজের নামে পরিচিত হতে।
  • আপনার একটি সফল Business to Business অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যবসার মধ্যে সমন্বয়কারী একটি কোম্পানি আছে এবং আপনি নিজের একটি অনলাইন প্লাটফর্ম চাচ্ছেন।
  • আপনার স্টার্ট-আপের জন্য আপনার হাতে ভালো পুঁজি আছে এবং আপনি চাচ্ছেন একটি অনলাইন শপ খুলে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।

অনলাইনে ব্যবসা হোক নিজের ডোমেইনে নিজের পরিচয়ে

আপনার হয়ত একটি ব্র্যান্ড নেম অলরেডি আছে আর আপনি ঐ নামটি ব্যবহার করতে চাচ্ছেন ডোমেইনের নাম হিসেবে। বুদ্ধিটা খারাপ নয় কিন্তু এখানে কিছু জিনিস হয়ত আপনি চিন্তা করেননি। আপনার কি সুনির্দিষ্ট কোন স্ট্র্যাটেজি আছে অনলাইনে ব্যবসাটি সফলভাবে চালানোর জন্য? অনলাইন ট্রাফিক আর অফলাইন ট্রাফিক কিন্তু একেবারেই আলাদা। রাস্তায় হেঁটে যেতে আপনার দোকান বা বিলবোর্ড পোস্টার আমাদের নজরে আসবে, অনলাইনে আপনাকে পাওয়ার জন্য আপনার ওয়েবসাইটকে খুঁজতে হবে সার্চ ইঞ্জিনের ভিতর দিয়ে। এক্ষেত্রে আপনার র‍্যাঙ্ক যদি ভাল না হয় তাহলে আপনাকে খুজে পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। আপনার যদি অনলাইন ট্রাফিককে নিজের দিকে আনার ইচ্ছে থাকে তাহলে আপনার ব্র্যান্ড নেমটি অবশ্যই SEO-friendly হতে হবে।(SEO-Search Engine Optimization; সার্চ ইঞ্জিনের সার্চ রেজাল্টে ফ্রিতে নিজের ওয়েবসাইট শুরুর দিকে রাখার কৌশল)

আসুন “US Paint Service” এর গল্পটি শুনি। পারিবারিক নামে ব্যবসা শুরু করে লাভজনক অবস্থানে পৌঁছে “US Paint Service” এর মালিক  সিদ্ধান্ত নেন অনলাইনে স্টোর খোলার। কিন্তু তিনি নামটি পালটে “US Paint Service” করায় তার লাভ বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২৪০০%। শুধু নাম পালটানোর জন্য সার্চ ইঞ্জিনের র‍্যাঙ্কিংএ কোম্পানিটি অনেক উপরে উঠে আসে। ভেবে দেখুন, আমি যদি রঙ কিনতে চাই অনলাইনে, আমি কি Paint Service লিখে সার্চ করব না আপনার নিজের দেয়া একটি নাম লিখে করব?

আপনার ডোমেইনের নাম সুচিন্তিতভাবে বেছে নেয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ। এই জায়গায় কোন ভুল করা চলবে না। আপনার হাতে যদি একটি সফল অফলাইন ব্যবসা থাকে, অনলাইনেও সেটিকে সফলভাবে শুরু করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে কিছু টিপসঃ

আপনার ডোমেইন নেম ব্র্যান্ড নেমেরই সমার্থক

আপনি যে নাম-ই সিলেক্ট করুন না কেন, আপনার লোগো আর সাইটের সাথে তার সামঞ্জস্য থাকা আবশ্যক। এখন ভাবুন আপনি টাইপ করলেন www.dinajpurmistanno.com, সাইটে গিয়ে দেখা গেল সেখানে বিক্রি হচ্ছে সেন্ডো গেঞ্জি আর কোন এক বলিউড অভিনেতা সেটা পরে আপনার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ঘটনাটি খুব এক্সট্রিম মনে হলেও এমনটি ঘটে এবং এরকম ঘটনা অনলাইন ট্রাফিককে আপনার পণ্য এবং আপনার সম্পর্কে একটি বিরূপ ধারণা দেবে। কাস্টমার যদি আপনার ব্র্যান্ডের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, আপনার ব্যবসায় ধস নামবে।

কাজেই আপনার ব্র্যান্ডের সাথে সামঞ্জন্স্য রেখেই ডোমেইন নেমটি বেছে নিতে হবে।

নজর কাড়ুন ছোট নামেই  

এক মাস বা এক বছর পর আপনার ডোমেইনটি আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন সেটা মাথায় রেখেই নামটি ঠিক করুন। বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় তারা ছোট ছোট নাম ব্যবহার করছে। এর কারণ হিসেবে বলা যায় ছোট নাম সহজেই মনে থাকে,আপনার পণ্যের উপর প্রিন্ট করতে জায়গা এবং খরচ কম পড়বে। আরেকটি বড় কারণ হল, মানুষের ধৈর্য অতিশয় কম। আপনার ডোমেইনের নাম যদি বিশাল সাইজের হয় -“www.besteggfrombestchickenfrombestchickenfarm”, অনেকেই শুধু একবার চোখ বুলিয়ে সরে যাবে। আপনি যদি এমনটা রাখতেন “www.BestEggsInTown“ তাহলে ডোমেইনটি সহজেই নজর কাড়তো। চেষ্টা করবেন ২০ ক্যারাক্টারের ভিতর নামটি রাখার।

ভাষার খেলা, লেখার ভাষা

বানানের ব্যপারে সতর্ক থাকা আবশ্যক, দরকার ছাড়া হাইফেন এবং নাম্বার ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। আপনার ব্র্যান্ডটি যদি প্রতিষ্ঠিত না হয়(যেমন- Nike, Adidas, Mozilla) তাহলে ভুল বানান খারাপ ইম্প্রেশন ফেলবে।সাধারণ মানুষ বোঝে এমন শব্দ ব্যবহার করাই শ্রেয়। আপনার শব্দচয়নের সাথে সাইকোলজির গভীর সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কটি আপনার একটি ধারালো অস্ত্র হতে পারে। কিছু শব্দ আপনাকে যেমন ভাল ধারণা দেয় আবার এর উল্টোটাও কিন্তু হয়। ইংরেজিতে এক বলে Word Connotation.

“তিনি ব্যবসায়ে সফল” আর “তিনি দোকানদারিতে সফল”- এখানে দুটি বাক্য কাছাকাছি অর্থ বহন করলেও প্রথম বাক্যটি পড়ার সময় আপনার মনে যা চলছে, দ্বিতীয়টি পড়ার সময়ও কি একই জিনিস চলছে? অবশ্যই না। দ্বিতীয়টি খানিকটা নেতিবাচক।

সবসময় যে আপনাকে Positive Connotation ব্যবহার করতে হবে এমনটি নয়। আপনাকে এমন কৌশল নিতে হবে যেন আপনার ডোমেইনের নামটি পড়ার পর পাঠকের অবচেতন মনে নামটির একটি ছাপ রয়ে যায়।

মাথায় রাখুন SEO এর খুঁটিনাটি

ফ্রি ট্রাফিক আপনার সাইটে আনার জন্য SEO সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ডোমেইনের নামটি যত বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে SEO তত বাড়বে। Keywords আর Sub-Folder ব্যবহার করতে ভুলবেন না।

অনলাইনে ব্যবসা হোক নিজের ডোমেইনে নিজের পরিচয়ে

  • সামঞ্জস্যতাঃ নির্দিষ্ট একটি সার্চ কোয়েরির সাথে আপনার সাইটটি যতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সার্চ রেজাল্টে সাইটটি ঠিক ততটাই উপরে থাকবে। আপনি যদি ক্যামেরা বিক্রয়য়ের একটি সাইট খুলে থাকেন, আপনার সাইট ডেসক্রিপশনে “ক্যামেরা” শব্দটি অনেকবার আসবে। আপনার ডোমেইন নেমে যদি “ক্যামেরা” থেকে থাকে সেটাও এক্ষেত্রে সহায়ক হবে। কিন্তু সবসময় এমনটা করলে চলবে না। আপনি যদি ফ্যাশন বিজনেসের জন্য সাইট খুলে থাকেন আর এর নাম দেন “www.clothesshoesbagsjeans.com” তাহলে খুব বাজে দেখায়। এক্ষেত্রে এমন একটি শব্দ ব্যবহার করুন যেটা আপনার পুরো বিজনেসটা একবারে তুলে ধরবে।
  • কি-ওয়ার্ডঃ আপনার পণ্যের নামটি আপনার সাইটের কি-ওয়ার্ড হিসেবে থাকবে। বুঝতেই পারছেন আপনার ডোমেইন নেমে যদি পণ্যের নাম থাকে তাহলে এটা ভাল প্রভাব ফেলবে SEO তে। আপনার ব্যবসাটি যদি কোন একটি নির্দিষ্ট পণ্যের হয়ে থাকে(Niche Business) তাহলে ডোমেইন নেমে অবশ্যই নামটি রাখার চেষ্টা করবেন। অনেক রকম পণ্যের হলে একটি Holistic Brand Name ডোমেইন নেমের সাথে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু ডোমেইন নেম আবার লম্বা করতে যাবেন না।
  • সাব-ডোমেইনের পরিবর্তে সাব-ফোল্ডারঃ ধরুন একটি কোম্পানির নাম PortableHDD. সাব ডোমেইন অনেকটা এরকমঃ
    • blog.PortableHDD.com
    • store.PortableHDD.com
    • resources.PortableHDD.com

    সাব-ফোল্ডার একইরকম হলেও আলাদা

    • PortableHDD.com/blog
    • PortableHDD.com/store
    • PortableHDD.com/resources

    দেখতে একইরকম হলেও গুগল এদের খুবই আলাদা নজরে দেখে। সাব-ডোমেইনকে গুগল একেকটি আলাদা ওয়েবসাইট হিসেবে দেখে আর সাব-ফোল্ডার গুলোকে ডোমেইনের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করে।সাব-ফোল্ডার ব্যবহার করলে আপনার SEO সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে কেননা গুগল মনে করবে আপনি একেকটি কি-ওয়ার্ডের জন্য আলাদা করে লাইব্রেরি তৈরি করছেন।

পরিশেষে 

এই কথাটি বারবার যদি বলি তাহলেও এর গুরুত্ব ঠিকভাবে তুলে ধরা হবে নাঃ “ডোমেইনের নাম সিলেক্ট করা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ”। কমপক্ষে পাঁচ বছরের জন্য ডোমেইনটি কিনে নেবেন। আপনার সাইটটিকে র‍্যাঙ্ক করার জন্য আলোচিত জিনিসগুলোই মাপকাঠি হিসেবে কাজ করবে।

তাড়াহুড়ো করবেন না। কি-ওয়ার্ড নিয়ে ইন্টারনেটে একটু ঘাঁটুন। সার্চ ইঞ্জিনগুলোর এলগোরিদম ঘন ঘন পালটানো হয়, আপগ্রেড করা হয়, যাতে আরো ইউজার-ফ্রেণ্ডলি হতে পারে। আপনার উচিত হবে এই ইউজারদের মতামত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা। ডোমেইনের কয়েকটি সম্ভাব্য নাম সিলেক্ট করে কাস্টমারদের সাথে আলোচনা করুন, আমরা যে টিপসগুলো দিলাম সেগুলো মাথায় রেখে খুলে ফেলুন আপনার ওয়েবসাইট আর হয়ে উঠুন সফল একজন অনলাইন উদ্যোক্তা।

Leave a Reply