ই-কমার্স বাংলা টিউটোরিয়ালঃ অনলাইনে কি বিক্রি করবেন?

আপনি অনলাইনে বিক্রি অথবা ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করতে চান, কিন্তু বুঝতে পারছেন না কোন প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করবেন, তাহলে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য। এই আর্টিকেলে মোটামুটি সঠিক প্রোডাক্ট নির্বাচনের জন্য যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে তার সবকিছুই সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথমেই আপনাকে অভিনন্দন অনলাইন ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য। বিপুল সম্ভাবনার এই সেক্টরে সফল হবার জন্য দরকার একটু বুদ্ধি আর পরিশ্রমের। সেই সাথে যেহেতু এটি একটি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা তাই প্রযুক্তির কিছু প্রাথমিক জ্ঞানও দরকার এতে।  শুরুতে অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না কোন পণ্য নিয়ে কাজ করবেন বা কিভাবে শুরু করবেন। এই সিদ্ধান্তটি অনেক চিন্তাভাবনা করে নিতে হবে কারণ আপনার অনলাইন ব্যবসার মূল ভিত্তি নির্ভর করছে এটার উপর। এই আর্টিকেলটি যদিও একটু বড় তারপরেও একটু কষ্ট করে পুরোটা পড়লে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। তাহলে আসুন মূল আলোচনায় আসা যাক।

ই-কমার্স বাংলা টিউটোরিয়ালঃ অনলাইনে কি বিক্রি করবেন?

কেন সবদিক চিন্তা করে প্রোডাক্ট সিলেক্ট করা গুরুত্বপূর্ণ ?

একটি অনলাইন ব্যবসার অনেকগুলো পার্ট থাকে যেমন: ব্র্যান্ডিং , মার্কেটিং, ডেলিভারি , ওয়েবসাইট ইত্যাদি। এই পার্টগুলোর প্রত্যেকটির  সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে আপনি অনলাইনে কি বিক্রি করবেন  তার সাথে। তার মানে যদি আপনার প্রোডাক্ট নির্বাচনে ভুল হয় তাহলে পরবর্তিতে প্ৰত্যেকটি ধাপে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন সময়। হাজারো প্রোডাক্ট থেকে আপনার জন্য কোনটা সঠিক  সেটা ঠিক করা অবশ্যই অনেক কঠিন একটি কাজ। তবে কিছু জিনিস মাথায় রেখে প্রোডাক্ট নিৰ্বাচন করলে সফল হবার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। একটা উদাহরণ থেকে বিষয়টা একটু পরিষ্কার হয়ে নেওয়া যাক। যেমন ধরুন আপনি ঠিক করলেন অনলাইনে টিভি বিক্রি করবেন, কিন্তু এত বড় একটা জিনিস সারাদেশে কিভাবে ডেলিভারি করবেন সেটা ভেবে দেখেছেন? অথবা ঠিক করলেন Diabetes এর ওষুধ বিক্রি করবেন, সেক্ষেত্রে ওষুধ বিক্রির যে লাইসেন্স বা লিগাল ডকুমেন্টস লাগে সেটা কিভাবে ম্যানেজ করবেন? দিনশেষে আপনি কি বিক্রি করবেন তার উপর সরাসরি প্রভাব রয়েছে নিচের বিষয়গুলোর :

  • ব্র্যান্ডিং ও ডিজাইন :  আপনার ওয়েবসাইট বা ফেইসবুক পেজের আউটলুক কেমন হবে সেটা পুরোটাই নির্ভর করে কি বিক্রি করবেন তার উপর। ফুলের দোকানের ওয়েবসাইট আর জুতার দোকানের ওয়েবসাইট নিশ্চই এক হবে না? আবার ছেলেদের প্রোডাক্টের ব্র্যান্ডিং নিশ্চই মেয়েদের প্রোডাক্টের মতো হবে না। আপনার লোগো, ব্র্যান্ড কালার, ব্যানার এগুলোর সবকিছুতেই যে পণ্য বিক্রি করবেন তার ছোঁয়া থাকাটা খুবই জরুরি।
  • মার্কেটিং:  মার্কেটিং পুরোটাই  নির্ভর করে আপনার বাজেট এবং টার্গেট কাস্টমার এর উপর। আর টার্গেট কাস্টমার কারা সেটা নির্ভর করছে আপনি কি বিক্রি করবেন তার উপর।
  • নিজের প্রশান্তি : আপনাকে এটা সবসময় মনে রাখতে হবে যে আপনার নিজের লাইফের অনেক বড় একটা সময় কাটাতে হবে আপনার ব্যবসা নিয়ে। তাই  এমন কোনো প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করা উচিত যেটার প্রতি আপনার ভালোলাগা আছে বা যেটা নিয়ে লম্বা সময় কাজ করতে আপনার বিরক্তি লাগবে না।

তাই কি বিক্রি করবেন এবং আপনার টার্গেট কাস্টমার হবে সেটা ঠিক করাটাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। এজন্য যথেষ্ট সময় দিয়ে মার্কেট রিসার্চ করে নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলুন এবার মার্কেট রিসার্চের বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে দেখে নেওয়া যাক।

কাস্টমার বেস ঠিক করা

প্রোডাক্ট নির্বাচনের পর খুব ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে করা আপনার টার্গেট কাস্টমার মানে করা আপনার প্রোডাক্টটি টাকা দিয়ে কিনতে আগ্রহী। টার্গেট কাস্টমারদের সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানা থাকলে আপনার প্রোডাক্টের দাম, মার্কেটিং কৌশল সর্বোপরি আপনার ব্র্যান্ডের গল্পটি ক্রেতার সামনে তুলে ধরতে সাহায্য করবে।

টার্গেট কাস্টমার ঠিক করার সময় নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে :

  • কাস্টমারের জনপ্রকৃতি বুঝে নেওয়া : আপনার কাস্টমারের ভালোভাবে বুঝতে করতে তাদের বয়স কত? তারা নারী, পুরুষ নাকি তরুণ তরুণী, তাদের আর্নিং সোর্স কি?  – এগুলো নিয়ে কিছুটা রিসার্চ করে নিতে হবে। ঠিকমতো কাস্টমারের প্রকৃতি বুঝতে পারলে তাদের কাছে মার্কেটিং করার কৌশল খুব সহজেই বুঝতে পারবেন।
  • কাস্টমারের মানসিকতা বুঝে নেওয়া :  জনপ্রকৃতি বোঝার পাশাপাশি কাস্টমারের মানিসকতা ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কেও ধারণা নিতে হবে। এজন্য তারা কোথায় যায়, তাদের সোশ্যাল স্ট্যাটাস কেমন, কোন বিষয়ে তাদের আগ্রহ বেশি, কোথায় তারা বেশি সময় কাটায়,  – সেগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। একবার কাস্টমারের মন বুঝতে পারলে তাদের কাছে বিক্রি করা অনেক সহজ হয়ে যাবে।
  • দামের ব্যাপারে কাস্টমের মনোভাব বুঝে নেওয়া : পণ্যের দামের ব্যাপারে টার্গেট কাস্টমারের মনোভাবটাও বুঝে নেওয়া জরুরি। আপনার পণ্যের দাম যদি তাদের সামর্থের বাইরে হয় তাহলে অনেক কাস্টমার ইচ্ছা থাকলেও কিনতে পারবে না। টার্গেট কাস্টমার উচ্চবিত্ত, মদ্ধবিত্ত নাকি মাঝামাঝি সেটা জানা থাকলে পণ্যের সঠিক দাম নির্ধারণ করতে পারবেন।

এরকম আরো অনেক বিষয় আছে যেগুলো পর্যালোচনা করে কাস্টমারের সম্পর্কে ধারণা আরো স্পষ্ট করে নেওয়া যায়। তবে শুরু করার জন্য বেসিক বিষয়গুলা সম্পর্কে ধারণা থাকলে আগেই নিশ্চিত হওয়া যাবে  যে আপনার পণ্য কাস্টমারের  চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা পূরণে সক্ষম। উপরের ফ্যাক্টরগুলো ছাড়াও কিছু প্রশ্ন নিজেকে করতে পারেন কাস্টমারকে আরও ভালোভাবে বুঝতে।  যেমন: কেন কাস্টমার আপনার পণ্যটি খুঁজছে? কি কারণে তারা টাকা দিয়ে পণ্যটি কিনতে চায়? পণ্যটি কি তারা তাদের দৈনন্দিন কাজের জন্য খুঁজছে নাকি তাদের লাইফ স্টাইল উন্নত করার জন্য খুঁজছে? আপনার পণ্যটি আরো অনেকেই বিক্রি করছে তাহলে কাস্টমার কেন আপনার থেকে পণ্যটি কিনবে? আপনি তাদেরকে অতিরিক্ত কি দিচ্ছেন? আসলে প্রথমে কাস্টমার চায় পণ্যটি যেন তার কোনো সমস্যার সমাধান করে, সেই সাথে পণ্যটি কেনার  খুব ভালো একটা experience ও প্রত্যাশা করে।  যেমন chaldal.com থেকে কোনো পণ্য কিনে ভালো লাগলে কাস্টমার সেটা ফেইসবুকে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে একটা ভালোলাগার অনুভূতি নিতে চায় অথবা কফি শপ এর আড্ডায় পণ্যটি হাতে পাবার পর কতটা excited ছিল সেটা নিয়ে গল্প করতে চায়। আপনি যদি ওই experience তা কাস্টোমারকে দিতে পারেন তাহলে আরো হাজার জায়গায় পণ্যটি পাওয়া গেলেও আপনার কাছ থেকেই কাস্টমার পণ্যটি কিনবে।

কাস্টমারের সাথে সম্পর্ক স্থাপন

কি পণ্য বিক্রি করবেন আর কারা আপনার টার্গেট কাস্টমার সেটা ঠিক হয়ে গেলে চিন্তা করতে হবে তাদের কাছে কিভাবে পৌঁছানো যায় বা সোজা করে বললে তাদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।  কাস্টমারের কাছে পৌঁছানো অনেকটা কোনো মেয়ে/ছেলেকে পছন্দ হলে তারসাথে বন্ধুত্ব তৈরী করার ধাপগুলোর মতো। তারা যেসব বিষয়ে আগ্রহ দেখায় আপনাকেও সেসব বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে হবে।  যেমন: তারা যেসব ফেইসবুক পেজে লাইক দেয় আপনাকেও সেসব পেজে লাইক দিতে হবে, তারা সোশ্যাল মিটআপ এর জন্য যেসব জায়গায় যায় আপনাকেও সেসব জায়গায় যেতে হবে। তাদের সাথে পরিচিত হবার পর তাদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে হবে। কি ধরণের পণ্য তাদের জীবনকে  আরো সহজ করবে বা তাদের সোশ্যাল স্ট্যাটাস বাড়াবে সেটা জেনে নিতে হবে। তারপর তাদের সেই সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে এরকমভাবে আপনার প্রোডাক্টলাইন সাজানোর চেষ্টা করতে হবে। এভাবে আপনি শুধু একজন পণ্য বিক্রেতা না হয়ে ওই সেক্টরে একজন এক্সপার্ট হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে কাস্টমার শুধু আস্থা ও  বিশ্বস্ততার জন্যই আপনার পণ্য কিনবে।

মার্কেট রিসার্চ

মার্কেট রিসার্চকে অনেকেই ব্যয়বহুল, জটিল ও কঠিন কাজ মনে করে থাকেন। আসলে কিন্তু বিষয়টি অতো জটিল কিছুনা। এই যুগে একটু চোখ কান খোলা রাখলে আর একটু বুদ্ধি করে কাজ করলে খুব সহজেই মার্কেট রিসার্চ করে ফেলতে পারবেন। মার্কেট রিসার্চ করা থাকলে ব্যাবসার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ও কাস্টমারের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা আরও স্পষ্ট হবে। অনলাইন বিজনেসে সফল হতে তাই এর কোনো বিকল্প নেই। মূলত নিচের দুইটি বিষয়ের উপর রিসার্চ করতে নিতে হবে :

  • মার্কেট ট্রেন্ড : আপনার যদি ইতিমধ্যে ধারণা থাকে যে কি প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করবেন তাহলে বর্তমান বাজারে সেটি কেমন চলছে সেটার উপর নজর রাখতে হবে। আর যদি প্রোডাক্ট ঠিক না করে থাকেন তাহলে বাজারে/মার্কেটপ্লেসে  কোন প্রোডাক্ট কেমন চলছে সেদিকে একটু খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য পত্রিকা, টিভিতে, অনলাইনে বা ফেইসবুক টাইমলাইনে কোন পণ্যের বিজ্ঞাপন বেশি চোখে পড়ছে সেদিকে একটু খেয়াল করলে কিছুটা ধারণা পাবেন। যদি কোনো নিৰ্দিষ্ট পণ্য নিয়ে কাজ করার প্ল্যান থাকে তাহলে ওই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে পত্রপত্রিকায় কোনো আর্টিকেল, রিপোর্ট বা গবেষণা প্রকাশিত হলে সেগুলোতে চোখ রাখতে হবে।  তাহলে বাজারে কোন পণ্য বেশি জনপ্রিয় সেটি বুঝতে পারবেন। অন্য অনলাইন শপগুলো কোন ধরণের প্রোডাক্টগুলো বেশি প্রচার করছে সেটা দেখেও মার্কেট ট্রেন্ড সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।  এছাড়াও ফেইসবুকে Buy এন্ড Sell গ্রুপগুলো এবং অনলাইন বিজনেস নিয়ে গ্রুপ গুলোতে চোখ রাখলেও কারেন্ট মার্কেট ট্রেন্ড বুঝতে পারবেন।
  • বাজারে প্রতিযোগিতা:আপনার প্রোডাক্ট যদি একেবারে ইউনিক না হয় তাহলে বাজারে কিছুটা প্রতিযোগিতা থাকবে এটাই স্বাভাৱিক। তবে প্রতিযোগিতা খুব বেশি নাকি খুব কম সেটা বোঝা জরুরি, তা না হলে ব্যবসার রিস্ক অনেক বেড়ে যাবে। বাজারে আপনার প্রোডাক্টের প্রতিযোগিতা বোঝার জন্য নিচের কাজগুলা করতে হবে:
    • প্রথমে আপনার প্রোডাক্ট আরো করা বিক্রি করছে তাদের একটা লিস্ট করে ফেলতে হবে। এই কাজটি ঘরে বসেই গুগল সার্চ করেই করে ফেলা যায়। এই ডাটা থেকে আপনি বুঝতে পারবেন বাজারে আর কে কে আছে আর কতজন আছে।
    • এরপর ডাটা দেখে সেগুলোকে কিছু ক্যাটাগরিতে ভাগ করে ফেলতে হবে।  কি কি ক্যাটাগরি হবে সেটা ডাটা দেখলেই বুঝতে পারবেন। যেমন: বড় প্রতিযোগীদের একটা ক্যাটাগরি করলে পারেন আর ছোট প্রতিযোগীদের আরেকটা ক্যাটাগরি।
    • তারপর সব প্রতিযোগীদের ওয়েবসাইট আর ফেইসবুক পেজ ভিসিট করতে হবে। তারা কোন প্রোডাক্ট হাইলাইট করছে, কিভাবে সেগুলোর ব্র্যান্ডিং করছে, পণ্যের দাম কত রাখছে সেগুলো সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।
    • যদি তাদের সাইটে নিউজলেটার সাবস্ক্রিপশন অপসন থাকে তাহলে সেখানে সাবস্ক্রাইব করতে হবে।  তাহলে তাদের প্রমোশনাল ইমেইলগুলো আপনার কাছে নিয়মিত আসবে এবং সেগুলো দেখে আপনি বুঝতে পারবেন অপনার প্রতিযোগীরা কিভাবে তাদের টার্গেট কাস্টোমারদের কাছে মার্কেটিং করছে।

এই মার্কেট রিসার্চের মূল বিষয় হলো বাজারে অন্যরা কিভাবে প্রোডাক্টের মার্কেটিং করছে সেটা জানা  এবং সেখান থেকে মার্কেট স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে ধারণা নেওয়া আর সেই অনুযায়ী আপনার নিজের মার্কেটিং স্টার্টেজি ঠিক করা যাতে অন্যদের থেকে আপনার প্রোডাক্ট কাস্টমারের কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারেন।

কত ধরণের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করবেন?

কত ধরণের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করবেন সেটি ঠিক করে নেওয়াটাও খুব জরুরি। বেশি প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করলে বেশি সেল হবে এই ধারণাটা সঠিক নয়। প্রোডাক্টের রকম ও সংখ্যা নির্ভর করছে আপনার বাজেট এবং সময় এর উপর। আপনার বাজেট কম হলে শুরুতে একটি বা দুইটি প্রোডাক্ট নিয়েও শুরু করা যেতে পারে। প্রোডাক্টের ভেরিয়েশন না বাড়িয়ে মূল একটি প্রোডাক্ট এবং সেগুলোর একসেসোরিজ নিয়ে কাজ করলে ভালো ফল পাবার সম্ভাবনা বেশি।  যেমন ধরুন যদি হিজাব নিয়ে কাজ করতে চান তাহলে সাথে কামিজ, টি-শার্ট  এগুলো নিয়ে কাজ না করে বরং হিজাব এর একসেসোরিজ নিয়ে কাজ করাটা বেশি যুক্তিসঙ্গত, কারণ যারা হিজাব কিনবে তাদের লাইফস্টাইল আর যারা টি-শার্ট কিনবে তাদের লাইফস্টাইল এক নয়।

প্রোডাক্টের খরচ

প্রোডাক্টের দাম কতো হবে সেটার অনেকটাই নির্ভর করে প্রোডাক্টটির পেছনে আপনার কত খরচ হয়েছে সেটার উপর। তাই কোন প্রোডাক্ট বিক্রি করবেন সেটা ঠিক করার জন্য প্রোডাক্টটি তৈরী করতে বা সংগ্রহ করতে কেমন খরচ পড়বে সেটা পর্যালোচনা করে দেখা জরুরি। মূলত দুইভাবে প্রোডাক্ট সংগ্রহ করা যাবে:

  • নিজে তৈরী করা: আমাদের দেশে অনলাইন সেলারদের মধ্যে যারা ক্র্যাফট বা ঘর সাজানোর জিনিস নিয়ে কাজ করেন তারা নিজেরা প্রোডাক্ট উৎপাদন করে থাকেন। এখানে মূল খরচ হচ্ছে কাঁচামাল কেনা, শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও  ডেলিভারি চার্জ।
  • হোলসেলার বা Supplier দের থেকে সংগ্রহ করা: আমাদের দেশে  হোলসেলারদের থেকেই বেশিরভাগ অনলাইন ব্যবসায়ী প্রোডাক্ট সোর্স করে থাকেন। এখানে মূল খরচ হচ্ছে প্রোডাক্টের দাম, প্রোডাক্ট নিজের ইনভেন্টরিতে মজুদের খরচ আর ডেলিভারি চার্জ।

প্রোডাক্টের পেছনে আপনার খরচের পাশাপাশি কিভাবে আপনি প্রোডাক্টটি সোর্স করছেন তার উপর অনলাইন বিজনেসের সফলতা অনেকখানি নির্ভর করে। যদি আপনার ট্যালেন্ট ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকে তাহলে নিজে প্রোডাক্ট তৈরী করে অনলাইনে বিক্রি করলে আপনার কাস্টমার থেকে পণ্য এবং আপনি নিজে প্রশংসা পাবেন। নিজে প্রোডাক্ট উৎপাদন করলে কতগুলো বানাবেন, দাম কত রাখবেন, প্রোডাক্টের গুণগত মান কেমন হবে সেগুলো সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। টি-শার্ট, ঘর সাজানোর জিনিস, ছেলে/মেয়েদের ড্রেস এই ধরণের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করতে চাইলে নিজে উৎপাদন করা সম্ভব। তবে নিজে উৎপাদন করলেও কিছু বিজনেস ফ্যাক্টর অবশ্যই মাথায় রাখা জরুরি:

  • আপনার কাঁচামাল কার থেকে সংগ্রহ করবেন এবং সেগুলো কিভাবে সংগ্রহ করবেন?
  • কাঁচামালের দাম কত পড়বে আর কাঁচামালের দামের উপর তৈরী করা প্রোডাক্টের দামের কতটা প্রভাব থাকবে?
  • প্রোডাক্ট তৈরী করতে কত সময় লাগে? মার্কেট চাহিদা অনুযায়ী আমি প্রোডাক্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রোডাক্ট তৈরী করতে পারবো তো?
  • যদি কাস্টমার কাস্টম বানিয়ে দিতে বলে তাহলে ঠিকভাবে দিতে পারবো তো?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পজিটিভ হলে নিজে প্রোডাক্ট তৈরী করে বিক্রি করাটাই শ্রেয়। এখানে মূল সুবিধা হলো থার্ড পার্টির উপর আপনার প্রোডাক্ট সংগ্রহ করার জন্য আপনাকে নির্ভর করতে হচ্ছে না। উৎপাদন নিজে করলে প্রোডাক্ট কস্টিংও কম হবে ফলে প্রফিট বেশি হবার সম্ভাবনা বেশি। তবে আপনার রেসপনসিবিলিটি একটু বেড়ে যাবে যেহেতু প্রোডাক্ট উৎপাদন ও বিক্রি দুইটি আলাদা বিষয়, তখন দুইদিকেই সময় দিতে হবে সঠিকভাবে বিজনেস চালানোর জন্য।

অপরদিকে যদি নিজে প্রোডাক্ট উৎপাদন করাটা আপনার জন্য সুবিধাজনক না হয় তাহলে হোলসেলার থেকে প্রোডাক্ট কিনে বিক্রি করতে হবে। সেক্ষেত্রে দায়িত্ব কিছুটা কমবে কিন্তু প্রোডাক্টের দাম ঠিক করা এবং চাহিদা অনুযায়ী সাপ্লাই দেবার ব্যাপারে আপনার নিজের কন্ট্রোল কমে যাবে। আর কতগুলো প্রোডাক্ট কিনে রাখবেন সেই সিন্ধান্তটাও বাজারের চাহিদা বুঝে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার হোলসেলারের সাথে  সহজ ও সুন্দর সম্পর্ক স্থাপন করাটা গুরুত্বপূর্ণ। পণ্যের রিটার্ন পলিসি, ডিসকাউন্ট এই বিষয়গুলো নিয়ে আগে থেকে হোলসেলারের আলাপ করে নিতে হবে যাতে কোনোভাবেই আপনার কাস্টমারের উপর নেগেটিভ প্রভাব না পরে।

এই পর্যায়ে আমরা যথেষ্ট জেনেবুঝে মার্কেট রিসার্চ করে  প্রোডাক্ট সিলেক্ট করেছি এবং সেগুলো সোর্স করার ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এখন সব থেকে মজার কাজ, সেটি হলো প্রোডাক্টের দাম ঠিক করা। প্রোডাক্টের সঠিক দাম আপনাকে মার্কেটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং প্রফিটেবল অনলাইন বিজনেস পরিচালনা করতে সহায়তা করবে।

কিভাবে প্রোডাক্টের দাম ঠিক করবো?

আমাদের দেশে হরহামেশাই দেখা যায় একই প্রোডাক্টের দাম একেক অনলাইন শপে একেকরকম। বেশিরভাগ অনলাইন ব্যাবসায়ী সব দিক চিন্তা না করে নিজের মনের মতো একটা দাম ঠিক করে থাকেন । অনুমান করে দাম ঠিক করার বড় অসুবিধা হলো সব রকম কস্ট ফ্যাক্টর প্রোডাক্টদের দামের মধ্যে যুক্ত হয় না, ফলে অনেকসময় এমন হতে পারে যে আপনার বিজনেস পরিচালনার খরচই  উঠে আসছে না। তাই প্রোডাক্টের দাম ঠিক করার আগে একটু ম্যাথ/অঙ্ক করে নিতে হবে।  নিচের চারটি ধাপ অনুসরণ করে খুব সহজেই লজিক্যালি প্রোডাক্টের দাম ঠিক করে ফেলা যাবে :

  • প্রথম ধাপঃ ওভারঅল প্রোডাক্টের খরচ নির্ধারণ করুন 

প্রোডাক্ট বিক্রির আগে কিছু খাতা কলমের হিসাব করে নেওয়া দরকার। পণ্য উৎপাদনের খরচ, বিপণন খরচ, সেলস খরচ, পরিবহন খরচ, ডেলিভারি খরচ ইত্যাদি।

আসুন একটি ছোট অঙ্ক করে দেখি, কিভাবে একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করবো। ধরুন এই শীতে আপনি চান হুডি বিক্রি করবেন। ঢাকার সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে পাঠরত সব ছাত্রছাত্রীরা আপনার টার্গেট অডিয়েন্স। তাদের হুডীর সামনে লিখে দিবেন, “Proud To Be A ….. Graduate

প্রত্যেকটি হুডির খরচঃ ১৮০-২২০ টাকা (নির্ভর করে কি পরিমাণ আপনি বানাবেন, মোটামুটি এই টাকার মধ্যে আপনি ভালো একটি হুডি পেয়ে যাবেন)

প্রত্যেকটি হুডির বিক্রির পিছনে মার্কেটিং খরচঃ ১০০ টাকা

— প্রত্যেকটি হুডির বিক্রির পিছনে ইনভেন্টরি, লজিস্টিকস, ম্যানপাওয়ার খরচঃ ১০০  টাকা

প্যাকেজিং খরচঃ ১০ টাকা

ডিজাইন ও প্রিন্টিং খরচঃ ৫০ টাকা

সর্বমোট খরচ ঃ ২২০ + ১০০ + ১০০+ ১০ + ৫০ = ৪৪০ টাকা।

  • দ্বিতীয় ধাপঃ আপনার ব্যবসার কাঙ্ক্ষিত লাভের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করুন

এইবার এই পণ্য দিয়ে আপনি আসলে কত লাভ অর্জন করতে চান, সেই মানটি সেট করুন। কিছু ব্যাপার আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। যেমন ধরুন, আপনি কত সংখ্যক হুডি বিক্রি করবেন? এটি কি আপনার এককালীন ব্যবসা? আপনার লাভের মার্জিন আপনি বাজারের চলতি প্রতিযোগিতাকে হার মানাতে কত কম দামে বিক্রি করতে পারবেন? আপনার আসল লক্ষ্য কি, বেশি পরিমাণে বিক্রি করে লাভ তুলে আনা নাকি অল্প সংখ্যক বিক্রি করেই বেশি দাম রেখে লাভের অঙ্কটি তুলে আনবেন।

ধরুন, আপনি ঠিক করলেন আপনি লাভ করতে চান ১৭০ টাকা প্রতি হুডিতে।

তাহলে আপনার প্রত্যেকটি হুডির দাম দাঁড়াবে , ৪৮০ + ১৭০ টাকা = ৬৫০ টাকা, যা কিনা বাজারের চলতি দাম হিসেবে যথেষ্টই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। আপনি চাইলে আপনার লাভের মার্জিন অনুসারে হুডির দাম এদিক ওদিক করতে পারেন হাল্কা পাতলা। এর মধ্যে খেয়াল করে দেখুন চাইলে আপনার ডেলিভারি কস্ট ও অ্যাড করা আছে। চাইলে আপনি ফ্রি ডেলিভারিও অফার করতে পারেন। অথবা আরেকটু দাম বাড়িয়ে ফ্রি ডেলিভারি সুবিধা দিতে পারেন। এগুলো পুরোই আপনার পরিকল্পনার অংশ। আর লাভের অঙ্ক যদি বেশি রাখতে চান তবে কোন কোন জায়গায় খরচ কমাতে পারেন সেগুলো নিয়ে আরেকটু ব্রেইনস্টর্মিং করে রাখতে পারেন।

নিচের বিষয় গুলো অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যখন আপনি পণ্যের দাম নির্ধারণ করবেনঃ

  •  আপনার পণ্যের ভ্যালু এডিশনঃ ক্রেতা যখন পণ্য কিনে তখন সে শুধু পণ্যটাঈ কিনে না, সাথে যেন এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা কিনে। ক্রেতাকে বিশেষভাবে গণ্য মনে করানো বিক্রেতা হিসেবে আপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিশেষ আকর্ষণীয় কোন প্যাকেজিং, ফ্রি রিটার্ন সুবিধা এই ধরনের সুবিধা যোগ করে দিন পণ্যের সাথে। যদি আপনি এমন কিছু অফার করছেন যা আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীরা করছে না নির্ভয়ে তার জন্যে ও আপনি চার্জ করতে পারেন।
  • ওভারপ্রাইসিংঃ   ওভারপ্রাইসিং আপনার পণ্যের বিশ্বাস হারাবে। সাথে সেলস তো কমবেই। লোভের গুড় না যাতে পিঁপড়া খেয়ে ফেলে সেদিকে নজর দিতে হবে।
  • আন্ডারপ্রাইসিংঃ পণ্যের কম দাম আবার আপনার পণ্যের মান নিয়ে ক্রেতার মনে প্রশ্ন জাগাবে। এতে ব্র্যান্ডিং এর ও এক ধরনের ক্ষতি হতে পারে সময়ে অসময়ে।

পরিশেষেঃ 

সবসময় মনে রাখা উচিত, যেই পণ্যই আমরা নির্বাচন করি না কেন সেটাই হবে ইকমার্স বিজনেস এর আদি ভিত্তি। এর উপর নির্ভর করেই আগামী দিনে আপনি আরও কি কি পণ্য যোগ করবেন আপনার সাইটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পণ্য নির্বাচনের প্রথম ধাপে অতি অবশ্য ভিত্তিতে আপনার টার্গেট অডিয়েন্স সিলেক্ট করে নিন। অনেক উত্তেজনা ও শিহরণ কাজ করছে আপনার মাথায়। অনেক নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছেন। দিনশেষে একটু সময় নিন। চেয়ারে বসে জিরিয়ে নিন। ভাবুন। স্ট্র্যাটেজিক সিদ্ধান্ত গুলো এক এক করে আবার চোখ বুলিয়ে নিন। পণ্য নিয়ে ভাবুন। কাকে কাকে এখানে সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে যোগ করা যায় এই ব্যাপারগুলোই আবার ভেবে চিন্তে দেখুন।

Leave a Reply